স্টাফ রিপোর্টার।। সরকারি কোনো পদ বা জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব না থাকা সত্ত্বেও হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া- এর সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়াকে ঘিরে টানা দুই দিন নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলায় উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মতবিনিময় সভা ও সরকারি দপ্তর পরিদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনের এমন ভূমিকা সরকারি বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না- তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাহুবল উপজেলা পরিষদের হলরুমে আরেকটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিমি কিবরিয়া। সভায় তার দুই পাশে বসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র দে ও বাহুবল মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ছাড়াও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত বুধবার নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে হবিগঞ্জ-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া- এর সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রেজা কিবরিয়া। সভা শুরুর কিছুক্ষণ পর তিনি সভাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর ওই সভার প্রধান অতিথির আসনে বসেন তার সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়া। তিনি সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। সভা শেষে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম তার সঙ্গে ছিলেন।
ওইদিন সকালে সিমি কিবরিয়া নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
এদিকে প্রশাসনিক ও আইন সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব কর্মসূচি সরকারি বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি কার্যবিধি (Rules of Business, 1996) অনুযায়ী প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সভা, মতবিনিময় বা সরকারি দপ্তর পরিদর্শনে অংশগ্রহণের সুযোগ কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত জনপ্রতিনিধি অথবা সরকার অনুমোদিত কোনো সংস্থা বা কমিটির প্রতিনিধিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সংসদ সদস্যের সহধর্মিণী কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা সরকার নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি না হওয়ায় তাকে প্রশাসনিক কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে বসানো কিংবা সরকারি দপ্তর পরিদর্শনে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা আইনগত বৈধতা রাখে কি না- সে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি দায়িত্বে না থাকা কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক মর্যাদা দিয়ে সভা পরিচালনা বা পরিদর্শনে অংশগ্রহণ করানো হলে সেটি আচরণবিধির সঙ্গে অসামঞ্জস্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, এমন কর্মকাণ্ডে যদি জেনেশুনে কোনো ব্যক্তিকে প্রশাসনিক সুবিধা বা প্রভাব প্রদানের বিষয় যুক্ত থাকে, তবে তা দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৬৬ ধারার আলোকে দায়িত্ব পালনে অবৈধতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জনগণের সেবক হিসেবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের যে নির্দেশনা রয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় তার ব্যত্যয় ঘটেছে কি না- সে বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সংসদ সদস্যের সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়াকে নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ও সরকারি বিধিমালার প্রয়োগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র দে সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Leave a Reply